শিক্ষামন্ত্রীর আশকারায় সব হয়েছেঃ ভিসি কলিমউল্লাহ

0
101

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতির সব দায় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির বলে অভিযোগ করেছেন উপাচার্য (ভিসি) ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ। গতকাল বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই অভিযোগ করেন।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর রুনি মিল’নায়তনে আয়ো’জিত নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো অস্বীকার করে তিনি বলেন, এসব অভিযোগ ও ইউজিসির এমন তদন্ত শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির আশ্রয়, প্রশ্রয় ও আশকারায় হয়েছে। এর প্ররিপ্রেক্ষিতে বিকেলে মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বক্তব্যে উপাচার্যের বক্তব্যকে ‘অনভিপ্রেত’ বলে উল্লেখ করা হয়।

অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার ৪৫টি অভিযোগ তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।

 

সম্প্রতি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি ১০ তলা ভবন নির্মাণকাজে উপাচার্যের অনিয়মের সত্যতা পেয়েছে ইউজিসির আরেকটি সরেজমিন তদন্ত কমিটি। এর জন্য উপাচার্যসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ওই কমিটির প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ জানান, তিনি ঝেড়ে কেশে বলার জন্যই সংবাদ সম্মেলনে বসেছেন এবং এ জন্য তাঁর পরিণতি কী হবে, সেটা বিবেচনা করেই এসেছেন। ইউজিসির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, ইউজিসির প্রতিবেদন কেন এমন হয়েছে, তার জন্যও পরিপূর্ণভাবে দায়দায়িত্ব শিক্ষামন্ত্রীর। তাঁর পরামর্শে তদন্ত কমিটি এমন আচরণ করেছে। ইউজিসির মর্যাদা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কলিমউল্লাহ। তিনি মনে করেন, ‘এসবের পেছনে কুমিল্লা ও চাঁদপুরের রাজনীতি আছে।’

সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য হয়েও নিজে ক্যাম্পাসে গরহাজির থাকা, প্রকল্পের অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে করা প্রশ্নের জবাব দেন কলিমউল্লাহ।

শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির প্রসঙ্গে কলিমউল্লাহ বলেন, ‘দীপু মনি দায়িত্ব গ্রহণ করার পরে অন্য সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যান সময় নির্ধারণ করে। মন্ত্রণালয়ে তাঁর অফিসে সকাল ১০টায় থাকলে তিনি হাজির হন বিকেল ৪টায়। আমাদের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের পুরোটা দিন তাঁর জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কখনো হয়নি এবং এই জাতীয় যে মনোভাব, এটির বহিঃপ্রকাশ হয়েছে তখনই। যতবার আমরা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাঁর কাছে যেতে চেয়েছি, ক্রোড়পত্রের জন্য বাণী চেয়েছি, একটিবারও তাঁর কাছে কোনো আশীর্বাদ পাইনি। আমাদের শিক্ষা উপমন্ত্রী খুবই সৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন। যতবার তাঁর কাছে গিয়েছি, তাঁর কাছে বাণী পেয়েছি, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে পেয়েছি, কিন্তু শিক্ষামন্ত্রীর কাছেই অবজ্ঞাটা লাভ করেছি।’

কলিমউল্লাহ দাবি করেন, ‘ইউজিসির রিপোর্টের পেছনে পুরোপুরি দায় শিক্ষামন্ত্রীর। তাঁর পরামর্শে কমিটি এই রকম রিপোর্ট করেছে। মূলত আমার অভিযোগের ভিত্তিতে এই বিষয়ে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে। কিন্তু মূল বিষয়টা হচ্ছে, যে কারণে এই সমস্যাটা, সেখান থেকে দৃশ্যটা ঘুরিয়ে দিয়ে দায় এড়ানোর অভিযোগ কেন করলাম সেটা অন্যায় হয়েছে। দেশে দুর্নীতি নিয়ে যে ধামাচাপা দেওয়ার একটা কালচার আছে, শিক্ষামন্ত্রীর অফিস থেকে রিপোর্টে কয়েকটি অংশ যুক্ত করা হয়েছে দোষ আমাদের ঘাড়ে দেওয়া জন্য; যাতে আমরা ভয় পেয়ে সত্য বিষয়টি প্রকাশ করতে দ্বিধা বোধ করি। এটা একেবারে একটি রাজনৈতিক ন্যক্কারজনক অপকৌশল।’ তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান; এ রকম হীনম্মন্যতা, রাজনীতি করার প্রতিষ্ঠান নয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য : উপাচার্যের এই বক্তব্যের বিষয়ে বিকেলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য কর্মকর্তা এম এ খায়েরের পাঠানো বক্তব্যে বলা হয়, বেগম রোকেয়া  বিশ্ববিদ্যালয়ে  বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে ইউজিসি তাদের নিয়মানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তদন্ত করে প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। ইউজিসি একটি  স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বিধায় এই প্রক্রিয়ায় কোনো পর্যায়ে মন্ত্রণালয় বা মন্ত্রীর পক্ষ থেকে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তারের কোনো সুযোগ নেই এবং এসংক্রান্ত বিষয়ে নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর অভিযোগ অসত্য, বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

আরো বলা হয়, জনাব কলিমউল্লাহ সরাসরি শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে কিছু ব্যক্তিগত আক্রমণ করে বক্তব্য দিয়েছেন, যা নিতান্তই অনভিপ্রেত। তিনি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের নিয়ে যে সভাটিতে মন্ত্রীর দেরিতে উপস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেছেন, সে  সভা গত ২০২০ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিউটে সকালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও পরে সময় পরিবর্তন করে বিকেলে নেওয়া হয়।

 

ওই একই দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের অভিন্ন ন্যূনতম যোগ্যতা নির্দেশিকা প্রণয়ন সংক্রান্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সভা থাকায় এবং সেই সভা উপাচার্যদের সঙ্গে আলোচনার আগে হলে ভালো হয় বিবেচিত হওয়ায় উপাচার্যদের সঙ্গে সভাটির সময় পরিবর্তন করা হয়েছিল। শিক্ষামন্ত্রী পরে উপাচার্যদের সঙ্গে সভায় অনিচ্ছাকৃত এই দেরির জন্য বিশেষভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন। সেদিনের অনিচ্ছাকৃত বিলম্ব নিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে মন্ত্রীর বিরুদ্ধে জনাব কলিমউল্লাহ যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনকই নয়, নিতান্তই রুচি বিবর্জিত।

মন্ত্রণালয় আরো বলেছে, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রকাশনার জন্য শিক্ষামন্ত্রীর একটি বাণী একবার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চাওয়া হয়েছিল। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বড় ধরনের ছাত্র আন্দোলন চলছিল। সে পরিস্থিতিতে শিক্ষামন্ত্রী সে বাণীটি দেওয়া সমীচীন মনে করেননি।

 

বেরোবিতে ভিসিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করল বঙ্গবন্ধু পরিষদ : কালের কণ্ঠ’র রংপুর অফিস ও বেরোবি প্রতিনিধি জানান, ঢাকায় বসে মিথ্যাচার, শিক্ষামন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করার অভিযোগ এনে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে বঙ্গবন্ধু পরিষদ।

 

এক সংবাদ সম্মেলনে বেরোবি বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান বলেন, উপাচার্য সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রীকে আক্রমণ করে কথা বলেছেন। স্পিকারসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। এমনকি ইউজিসি বিষয়েও বাজে মন্তব্য করেছেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু পরিষদের সহসভাপতি এইচ এম তরিকুল ইসলাম ও রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ উপস্থিত ছিলেন। উপাচার্যের কুশপুত্তলিকা দাহ : এদিকে নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদে বেরোবি ক্যাম্পাসে সন্ধ্যায় তাঁর কুশপুত্তলিকা দাহ ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শাখা ছাত্রলীগ ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া ক্যাম্পাসে তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here